লিচুর উপকারিতা ও ঔষধি গুণ

লিচুর উপকারিতা ও ঔষধি গুণ

"<yoastmark

লিচু আমাদের দেশের জনপ্রিয় ও অতি পরিচিত ফল। লিচুর উপকারিতা ও ঔষধি গুণ আমরা হয়তো অনেকেই জানি না। লিচু অতি সুন্দর একটি নিয়ামত আল্লাহর। আল্লাহ যেখানে মানুষ সৃষ্টি করেছেন তার আশপাশে খাদ্যশস্যের ভিতরেও রোগ আরোগ্যের শেফাও দিয়েছেন। আমরা জানি, বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন রোগের আগমন ঘটে। কিন্তু আল্লাহ এতই মেহেরবান যে, ওইসব মৌসুমি রোগ প্রতিরোধের জন্য হরেক রকম ফলমূলও দান করেন, যাতে তার প্রিয় বান্দারা সুস্থ থাকতে পারে ওইসব ফলমূল খেয়ে। আর লিচু তেমনি একটি ফল।

গ্রীষ্মকালের মিষ্টি, সুস্বাদু ও রসালো ফলের একটি। এই গরমে লিচুর রসালো স্বাদ ছোট বড় সকলেরই পছন্দ। শুধু খেতেই রসালো নয়, মৌসুমি এই ফল ভিটামিন ও খাদ্যশক্তির অন্যতম উৎস। এতে রয়েছে মানব শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান।

শক্তির একটি ভালো উৎস লিচু। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচু থেকে ৬১ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এটি শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। পাশাপাশি চর্বি কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া লিচুতে আছে খাদ্য হজমকারী আঁশ, ভিটামিন এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।

লিচুতে রয়েছে ভিটামিন ‘সি’ যা ত্বক, দাঁত ও হাড়ের জন্য উপকারী। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ৩১ মি.গ্রা ভিটামিন সি পাওয়া যায়। নানারকম চর্মরোগ ও স্কার্ভি রোগ দূর করতে সাহায্য করে ভিটামিন সি।

তাছাড়া লিচুতে আছে খাদ্য হজমকারী আঁশ, ভিটামিন এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। লিচু মানবদেহে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতাও হ্রাস করে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ ধ্বংস করে। এতে অবস্থিত ফ্ল্যাভানয়েডস নামক উপাদান স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

লিচু যেমন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তেমনি ত্বকের যত্নেও এটি অতুলনীয়। লিচু ত্বক উজ্জ্বল করতে ও বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে। রোদে পুড়ে কালচে হয়ে যাওয়া ত্বকে লিচু চটকে ভিটামিন-ই ক্যাপসুল মিশিয়ে লাগিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে দারুণ উপকার পাওয়া যায়।

লিচু ফলের নানা উপকারিতা:

আপনি কি জানেন ফলটি ত্বক, চুল ও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী? লিচুতে শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানগুলো প্রচুর পরিমাণে থাকে। আকৃতির দিক দিয়ে ছোট হলেও এর পুষ্টি গুনাগুন ও উপকারিতা অনেক ।

  • লিচুতে রয়েছে ভিটামিন সি যা এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে । এন্টি অক্সিডেন্ট ত্বককে সুন্দর রাখে সুস্থ রাখে এবং বয়সের ছাপ থেকে দুরে রাখে।
  • লিচুতে রয়েছে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম যা ইলেকট্রলাইট ব্যালান্স ঠিক রাখে এবং সোডিয়ামকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • লিচুর পটাশিয়াম ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
  • লিচুতে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম , আয়রন, কপার, ফলেট এবং ম্যাঙ্গানিজ যা লোহিত কনিকা তৈরিতে সহায়তা করে এবং মিনারেলস এর চাহিদাও পূরণ করে থাকে।
  • লিচু অ্যাজমা প্রতিরোধে সাহায্য করে ।
  • এতে রয়েছে ফাইবার যা হার্ট ভালো রাখে।
  • লিচু ন্যাচারাল সুগার এনার্জি লেভেল ঠিক রাখে।
  • লিচুতে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স যা রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
  • লিচুতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। তাই লিচু হজমে সাহায্য করে। কনস্টিপেশনের সমস্যায় লিচু অত্যন্ত উপকারী।
  • পেটের যাবতীয় গোলমাল মেটাতে লিচু খুবই সহায়ক।
  • লিচু ইমিউনিটি বাড়ায়। আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনের অ্যাসক্রোবিক অ্যাসিডের পুরোটাই লিচু থেকে পাওয়া যায়। এই কারণে লিচু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শ্বেত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা বাড়ায় লিচু।
  • ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ায়। লিচুতে থাকা তামা আমাদের শরীরের ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ায়। রক্তের রোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় লিচু। লোহিত কণিকা শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফলে আমাদের হার্টও ভালো থাকে।
  • ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রক: লিচু রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। লিচুর মধ্যে থাকা পটাসিয়াম শিরা ও ধমনীর ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।
  • ত্বকের জন্য ভালো: লিচু আমাদের ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে। লিচুর মধ্যে থেকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি ত্বককে উজ্জ্বল ও মোলায়েম করে তোলে।
  • ওজন কমায়: লিচুর মধ্যে থাকা ডায়েটারি ফাইবার ওজন কমানোর জন্য খুবই উপকারী। লিচুর মধ্যে জলীয় উপাদান প্রচুর এবং ক্যালোরি কম। তাই ওজন কমানোর জন্য লিচু একেবারে আদর্শ ফল। এছাড়াও ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, কপার রয়েছে লিচুতে।
  • কাশি, পেটব্যথা, টিউমার এবং গ্যান্ডের বৃদ্ধি দমনে লিচু ফল কার্যকর।
  • লিচুতে রয়েছে অলিগোনল নামের এক ধরনের উপাদান। একে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লুয়েঞ্জা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ উপাদান রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে। ত্বকে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে।

লিচুর পুষ্টি তালিকা:

প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে রয়েছে-জলীয় অংশ ৮৪.১, ক্যালসিয়াম ১০ মি., মোট খনিজ ০.৫, লৌহ ০.৭ মি., আঁশ ০.৫, ক্যারোটিন (মাইক্রোগ্রাম) ০, খাদ্যশক্তি (কিলোক্যালরি) ৬১, ভিটামিন বি-১ ০.০২, আমিষ ১.১, ভিটামিন ০.০৬ মি., চর্বি ০.২, ভিটামিন সি ৩১ মি., শর্করা ১৩.৬।

লিচুর ঔষধি গুণ :

  • লিচু শরীর ঠান্ডা রাখে।
  • তৃষ্ণা মেটায় ও শরীরের বল বাড়ায়।
  • শরীরের বায়ু, কফ ও পিত্ত নাশ করে।
  • অত্যধিক ক্লান্তিতে বা দীর্ঘ রোগভোগের পর দুর্বলতায় প্রতিদিন চার-পাঁচটি লিচু সামান্য লবণ মিশিয়ে খেলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়।
  • মস্তিষ্কের দুর্বলতায় স্মৃতিবিভ্রম ঘটলে ভুলো মন মানুষজন দিনে আট দশটা লিচু লবণ মিশিয়ে খেলে স্মৃতি স্বাভাবিক হয়।
  • হৃদরোগী ও লিভারের রোগীদের পক্ষে লিচু উপকারী।
  • মৌসুমের সময় দু-বেলা চার-পাঁচটি করে লিচু খেলে বয়স বাড়লেও শরীরে লাবণ্য বজায় থাকে।
  • যকৃতের রোগে ভুগলে ঠিকমতো খিদে হয় না। খাদ্যে অরুচি ভাব হয়। এক্ষেত্রে দিনে দুবার লিচুর শরবত খেলে বা দু-বেলা ৫-৭টি লিচু খেলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।
  • কাশি, পেটব্যথা, টিউমার এবং গ্যান্ডের বৃদ্ধি দমনে লিচু ফল কার্যকর।

মাত্রাতিরিক্ত লিচু খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে: লিচুর যে শুধু উপকারিতা ও ঔষধি গুণ রয়েছে তা কিন্তু নয়। মাত্রাতিরিক্ত লিচু খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। চলুন জেনে নেই মাত্রাতিরিক্ত লিচুর খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

  • লিচু খেলে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পাড়ে- একটানা বেশ কয়েকদিন বেশি পরিমানে লিচু খাওয়া হলে নানা রোগ যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্কলেরসিস, লুপাস ইত্যাদি রোগ থাকলে তা বেড়ে যেতে পারে। অতিমাত্রায় ইমিউনিটি বেড়ে যাওয়ার ফলে।
  • লিচু ওজন বৃদ্ধি করে: প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ৬৬ ক্যালোরি রয়েছে। পরিমাণে বেশি লিচু খেলে তাতে যে পরিমাণ ক্যালোরি জমা হয় তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে আমাদের ওজন বেশ ভালোভাবেই বৃদ্ধি পায়।

  • রক্তের গ্লুকোজ কমে যায়। লিচু আমাদের রক্তের গ্লুকোজ কমাতে সাহায্য করে। তাই পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেললে তা হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস আছে, যারা ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা লিচু গ্রহণে সাবধান থাকা উচিত। কারণ ওষুধ এমনিতেই রক্তে গ্লুকোজ কমিয়ে রাখে সঙ্গে লিচুও যদি িএকই কাজ করে তাহলে যেকোনো বিপত্তি ঘটতে পারে। ছোট বাচ্চারা লিচু গ্রহণ করলে কোনও অবস্থাতেই খালি পেটে খাওয়া উচিৎ নয়।
  • রক্তচাপ পড়ে যাওয়া- মাত্রাতিরিক্ত লিচু খেলে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। লক্ষণ হিসাবে শ্বাসকষ্ট হওয়া, বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘুরানো, বমি ভাব ইত্যাদি হতে পারে।
  • লিচু একটি গরম ফল- গরম ফল হওয়াতে বেশি পরিমানে লিচু খেলে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার ব্যালেন্স নষ্ট হয় ফলে গলা ব্যথা হওয়া, মুখের ভিতরে ক্ষত হওয়া এমনকি নাক দিয়ে রক্তপাতও হতে পারে।
  • সার্জারির রোগীদের অতিরিক্ত লিচু খাওয়ার ঝুঁকি: রক্তচাপ এবং রক্তে গ্লুকোজের ওপর সরাসরি প্রভাব থাকাতে যাদের সার্জারির প্রয়োজন, তাদের সার্জারির পূর্বের ২ সপ্তাহ এবং পরের ২ সপ্তাহ লিচু খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

সবশেষে এ সত্যটি মনে রাখুন কোনো মুসলমান যদি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, অথবা শস্য লাগায়, তা থেকে মানুষ, পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তু ভক্ষণ করে, তাহলে ওই ফসল রোপণকারীর সদকাহ হিসেবে তা গণ্য হবে। তাই রোগমুক্ত জীবন চান, ফল ঔষধির চারা বাড়ান। গাছের মতো বন্ধু নাই, খাদ্য পুষ্টি ওষুধ পাই।

আরএম/ ২ জুন, ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 5 =

12/1 Ring Road, Shyamoli, Dhaka

09666 77 44 11

dprchospital@dprcbd.com